বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় দ্বীপ সেন্টমার্টিন, যেখানে নীল জলরাশি আর আকাশ একসাথে মিশে গেছে। সাগরের বুকে ছোট্ট এই প্রবাল দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক শান্ত স্বর্গ। যারা জীবনে অন্তত একবার সেন্টমার্টিন ঘুরে যেতে চান, তাদের জন্য এই পোস্টে থাকছে টিকিট বুকিং থেকে শুরু করে যাওয়া, থাকা, ও ঘোরাফেরা সম্পর্কে বিস্তারিত গাইডলাইন।
কিভাবে যাবেন সেন্টমার্টিন?
সেন্টমার্টিন যেতে হলে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে টেকনাফ। ঢাকা থেকে টেকনাফে পৌঁছানোর জন্য কয়েকটি অপশন রয়েছে:
1. বাসে ঢাকা → কক্সবাজার → টেকনাফ: প্রথমে নন-এসি/এসি বাসে কক্সবাজার যান (গ্রীনলাইন, সৌদিয়া, ইউনিক ইত্যাদি)। কক্সবাজার থেকে লোকাল বাস বা মাইক্রোবাসে টেকনাফ যেতে পারবেন।
2. ঢাকা → সরাসরি টেকনাফ: কিছু বাস কোম্পানি সরাসরি টেকনাফে যায়। যেমন: শ্যামলী, সেন্টমার্টিন পরিবহন ইত্যাদি।
3. উড়োজাহাজে কক্সবাজার → টেকনাফ: বিমানে কক্সবাজার গিয়ে সেখান থেকে টেকনাফ যাওয়া যায়। তবে খরচ একটু বেশি।
টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন – জাহাজের টিকিট বুকিং
সেন্টমার্টিন যাওয়ার মূল মাধ্যম হলো *ক্রুজ/জাহাজ*। টেকনাফ থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে জাহাজ ছাড়ে এবং দুপুরে ফিরে আসে।
প্রধান জাহাজ সার্ভিসগুলো:
- Keari Sindbad
- Sea Pearl
- Bay Cruise
- L.T. Kutubdia
টিকিট বুকিং কোথায় পাবেন?
- অনলাইনে: Keari, Shohoz, Obhai বা অন্যান্য ট্যুর অপারেটরের ওয়েবসাইটে।
- সরাসরি টেকনাফ কাউন্টারে গিয়েও টিকিট কাটতে পারেন।
টিকিটের মূল্য:
- ডেক: ৫৫০–৮০০ টাকা
- চেয়ার: ৮০০–১০০০ টাকা
- কেবিন: ১২০০–২০০০ টাকা (দুইজনের জন্য)
টিপস:
- পিক সিজনে (নভেম্বর–মার্চ) আগেই বুকিং করে ফেলুন।
- জাতীয় পরিচয়পত্র/ভোটার ID লাগবে।
সেন্টমার্টিনে থাকার জায়গা
দ্বীপে প্রচুর হোটেল ও কটেজ রয়েছে, যেমন:
- Blue Marine Resort
- Sea View Resort
- Prince Heaven
- Coral View Resort
রুম রেন্ট ১০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। শীতকালে দাম বাড়ে, তাই অগ্রিম বুকিং ভালো।
সেন্টমার্টিনে ঘোরার জন্য যা যা দেখবেন:
- গলাচিপা পয়েন্ট: একদম দ্বীপের শেষ প্রান্তে অবস্থিত, সূর্যাস্তের জন্য বিখ্যাত।
- চেরা দ্বীপ: জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভরশীল। হাঁটাপথে বা নৌকা দিয়ে যেতে হয়।
- পাথরের সৈকত: যেখানে সাগরের পাথর আর প্রবালের সমাহার।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। দ্বীপে প্লাস্টিক নেওয়া নিষেধ।
- প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, সানস্ক্রিন, হালকা জামাকাপড় সাথে রাখুন।
- সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রাতে ছেড়া দ্বীপে থাকা যায় না।
সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে কিছু পরিকল্পনা অবশ্যই করতে হবে। ভ্রমণের মৌসুম, জাহাজের সময়সূচি, আবাসনের বুকিং এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতি মিলিয়ে একটি সুন্দর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে টিকিট বুকিং করলে ঝামেলা কম হবে এবং আপনি পুরো ট্রিপটা নির্ভার উপভোগ করতে পারবেন।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণে অধিকাংশ মানুষ সাধারণ তথ্য জানলেও কিছু *আনকমন গাইডলাইন* রয়েছে, যা আপনার ট্রিপকে অন্যদের থেকে আলাদা ও ঝামেলামুক্ত করে তুলবে।
প্রথমত, জাহাজে উঠার আগেই খাবার ও পানীয় সঙ্গে রাখুন। অনেক সময় জাহাজে নির্দিষ্ট খাবার পাওয়া যায় না বা দাম দ্বিগুণ হয়ে থাকে। হালকা শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ভেজানো খেজুর বা ফল নিয়ে গেলে জাহাজের যাত্রা উপভোগ্য হবে।
সেন্টমার্টিনে নগদ টাকা সাথেই রাখুন। যদিও কিছু জায়গায় বিকাশ/নগদ চলে, কিন্তু ইন্টারনেট সিগনাল দুর্বল থাকায় পেমেন্টে সমস্যা হতে পারে। এছাড়া ATM নেই বললেই চলে। তাই পর্যাপ্ত ক্যাশ নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সাইকেল বা বাইক ভাড়া নেওয়ার সময় চুক্তিটি লিখিত করুন। অনেক পর্যটক মৌখিক চুক্তিতে ঝামেলায় পড়েন। বিশেষ করে সময়মতো ফেরত না দিলে বা সামান্য স্ক্র্যাচ নিয়েও অতিরিক্ত জরিমানা দাবি করা হয়।
লোকালদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন। দ্বীপের বাসিন্দারা পর্যটনের উপর নির্ভর করে জীবিকা চালান। দর কষাকষির সময় সম্মান বজায় রেখে আলোচনা করুন, এবং স্থানীয় পণ্য কিনে তাদের উৎসাহ দিন।
ভোরবেলা জেগে সূর্যোদয় দেখার চেষ্টা করুন। অধিকাংশ মানুষ সূর্যাস্ত দেখেই খুশি থাকে, কিন্তু সেন্টমার্টিনে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়া এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সকালে হালকা হাঁটাহাঁটি ও ফ্রেশ বাতাসের অভিজ্ঞতা আলাদা।
ছেরা দ্বীপে যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটার সময় দেখে নিন। ভুল সময়ে গেলে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। স্থানীয় গাইড বা হোটেল থেকে এই তথ্য আগেই জেনে রাখুন।
সবশেষে, ফোন বা ক্যামেরার জন্য একাধিক চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যান। দ্বীপে বিদ্যুৎ সব সময় থাকে না, এবং অনেক সময় রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে যায়। তাই নিজের ডিভাইস সচল রাখতে প্রস্তুত থাকুন।
এইসব ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ টিপস মেনে চললে আপনার সেন্টমার্টিন ভ্রমণ হবে ঝামেলামুক্ত, স্মরণীয় এবং সবার চেয়ে একটু আলাদা। প্রকৃতি উপভোগ করুন, কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে।
এই গাইড অনুসরণ করে আপনি সহজেই সেন্টমার্টিনে একটি স্মরণীয় সফর উপভোগ করতে পারবেন—অবকাশের সেরা ঠিকানা, শান্তির দ্বীপ সেন্টমার্টিন আপনার অপেক্ষায়!

