বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এমন কিছু জেলা আছে, যাদের সৌন্দর্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তেমনই একটি জেলা চাঁদপুর—যেখানে তিন নদীর মিলন, ইলিশের রাজ্য আর হৃদয়ের মতো প্রসারিত নদীকূল একে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন, নদীর টানে ছুটে যেতে চান, কিংবা ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ছোঁয়া খুঁজেন—তাদের জন্য চাঁদপুর হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।
চাঁদপুর শুধুই ইলিশের শহর নয়, এটি গল্পের শহর। এখানকার প্রতিটি রাস্তা, ঘাট, ঘাটের পাশে বসা জেলেরা, কিশোরদের সাইকেলের ঘণ্টা, বিকেলের ইলিশ ভাজা আর মেঘনার হিমেল হাওয়া—সবকিছু যেন আপনাকে ছুঁয়ে যাবে এক নরম, শান্ত আবেগে। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য চাঁদপুর একেবারেই উপযুক্ত, কারণ এটি ঢাকার কাছাকাছি এবং যাতায়াত অত্যন্ত সহজ।
এই লেখায় আমরা চাঁদপুর জেলার ১০টি দর্শনীয় স্থানের নাম, সেগুলোতে যাওয়ার উপায় এবং প্রয়োজনীয় কিছু ভ্রমণ টিপস তুলে ধরেছি, যা আপনার পরবর্তী ট্যুর প্ল্যানকে আরও সহজ করবে।
চাঁদপুর, বাংলাদেশের একটি নদীঘেরা জেলা যা পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। এটি শুধু ইলিশ মাছের জন্য বিখ্যাত নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় গুরুত্বেও বিশেষভাবে পরিচিত। ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় চাঁদপুর ভ্রমণের জন্য একটি সহজ এবং আকর্ষণীয় গন্তব্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক চাঁদপুর ও তার আশেপাশের ১০টি দর্শনীয় স্থানের নাম এবং কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়।
১. বড় স্টেশন মোলহেড (Mohalghat, Chandpur Sadar)
চাঁদপুর শহরের কেন্দ্রেই এই জায়গা অবস্থিত, যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল। এখানে সূর্যাস্ত দেখা এক মনমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা।
*যাওয়ার উপায়:* চাঁদপুর শহরে পৌঁছে রিকশা বা অটোতে সহজেই পৌঁছানো যায়।
২. ইলিশ পার্ক (Hilsha Park)
নদীপাড়ে নির্মিত এই পার্কে রয়েছে হাঁটার পথ, বসার বেঞ্চ এবং শিশুদের খেলার জায়গা। পরিবারের জন্য আদর্শ স্পট।
যাওয়ার উপায়: চাঁদপুর শহরের স্টেশন রোড থেকে ৫ মিনিটের পথ।
৩. চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর
শিক্ষণীয় এবং শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় এই জাদুঘর প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের নানা দিক তুলে ধরে।
যাওয়ার উপায়: শহরের মধ্যেই অবস্থিত; যেকোনো লোকাল যানবাহনে যাওয়া যায়।
৪. বাবুরহাট বাজার
চাঁদপুরের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। এখানকার ইলিশ, চাল ও শাকসবজি সারা দেশে সরবরাহ হয়।
যাওয়ার উপায়: শহরের যেকোনো জায়গা থেকে রিকশায় যাওয়া যায়।
৫. হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ
এই ঐতিহাসিক মসজিদটি স্থাপত্য ও ধর্মীয় গুরুত্বে ভরপুর। স্থানীয়রা একে “বাংলার তাজমহল” বলে অভিহিত করে।
যাওয়ার উপায়: চাঁদপুর থেকে হাজীগঞ্জ বাসে, এরপর অটোতে যাওয়া যায়।
৬. মতলব উত্তরের মেঘনা নদীর পাড়
নদীপারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে এটি এক আদর্শ জায়গা।
যাওয়ার উপায়: চাঁদপুর শহর থেকে মতলব উত্তর বাসে, এরপর সিএনজি বা অটো।
৭. ফরিদগঞ্জের চিতোষী বাজার
গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পেতে চাইলে চিতোষী বাজারে ঘুরে আসা যেতে পারে। বাজারের পাশেই রয়েছে প্রাচীন ঘরবাড়ি ও মন্দির।
যাওয়ার উপায়: ফরিদগঞ্জ রুটে লোকাল বাসে, তারপর পায়ে হেঁটে।
৮. ষাটনল পর্যটন কেন্দ্র
এই স্থানটি মেঘনা নদীর পাড়ে একটি পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে নৌভ্রমণের সুবিধা ও পিকনিকের স্থান রয়েছে।
যাওয়ার উপায়: কচুয়া বা মতলব হয়ে যাওয়া যায়। লোকাল বাস বা সিএনজি ব্যবহার করতে হবে।
৯. পুরানবাজার কালীবাড়ি
হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান, যা উৎসবকালে খুবই জমজমাট হয়ে ওঠে।
যাওয়ার উপায়: শহর থেকে রিকশা বা টেম্পুতে পৌঁছানো যায়।
১০. নানুপুর বৌদ্ধ বিহার (কচুয়া)
এই বৌদ্ধ বিহারটি ধর্মীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দেশি-বিদেশি ভক্তরা প্রার্থনার জন্য আসেন।
যাওয়ার উপায়: কচুয়া উপজেলা হয়ে সিএনজিতে যেতে হয়।
যেভাবে চাঁদপুর যাবেন
ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাওয়ার উপায়:
- বাস: সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফার্মগেট থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায় (সপ্তাহের প্রতিদিন)।
- লঞ্চ: সদরঘাট থেকে প্রতিদিন লঞ্চ চলে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে, যা ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
- ট্রেন: কমলাপুর ও গাজীপুর থেকে আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে—"মেঘনা এক্সপ্রেস", "চাঁদপুর এক্সপ্রেস" অন্যতম।
স্থানীয় যাতায়াত: চাঁদপুর শহরে অটো, রিকশা, টেম্পু সহজেই পাওয়া যায়। উপজেলায় যেতে হলে লোকাল বাস, সিএনজি বা মাইক্রোবাস ব্যবহার করুন।
চাঁদপুর ভ্রমণ শুধু ঘোরাঘুরির বিষয় নয়—এটি প্রকৃতিকে অনুভব করার একটি অভিজ্ঞতা। নদী, মানুষ, ঐতিহ্য আর ইলিশের স্বাদ মিলিয়ে চাঁদপুরে কাটানো সময় সবসময় মনে থাকবে। পরিবার, বন্ধু কিংবা একক ভ্রমণ—সবধরনের ভ্রমণকারীর জন্য চাঁদপুর একটি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় জায়গা। আপনার পরবর্তী ছোট্ট গন্তব্য হোক চাঁদপুর।
চাঁদপুর ঘুরে এসে বুঝবেন—ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা দেখা নয়, মানুষের গল্প শোনা, নদীর ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়া, কিংবা ইলিশের স্বাদে মনকে একটুখানি তৃপ্ত করা। চাঁদপুরে রয়েছে সেইসব ক্ষণিক আনন্দের মুহূর্ত, যা দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়।
আপনার ভ্রমণ যদি হয় ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি কাটাতে, তবে চাঁদপুর আপনাকে দেবে শান্তির ছোঁয়া। আর যদি হয় পরিবারের সঙ্গে কিছু সুন্দর সময় কাটানো, তাহলেও এই জেলা আপনাকে দেবে সেই আদর্শ পরিবেশ। এখানে আপনি পেয়ে যাবেন প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভালোবাসার নিঃশব্দ অনুভব।
ভ্রমণের তালিকায় চাঁদপুরকে রাখুন, সময় নিয়ে পরিকল্পনা করুন এবং বেরিয়ে পড়ুন শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, এক শান্ত নদীগ্রামের টানে। ফিরবেন অনেক গল্প নিয়ে, মনের ভাঁজে কিছু শান্তি নিয়ে।

