বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির অপূর্ব সংমিশ্রণ যদি একসাথে উপভোগ করতে চান, তাহলে কুমিল্লার কোটবাড়ি হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। ঢাকার অতি কাছেই অবস্থিত এই স্থানটি ইতিহাসপ্রেমী, প্রকৃতিপ্রেমী ও সাধারণ পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। চমৎকার সবুজ পাহাড়ঘেরা পরিবেশ, প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এবং মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট—সব মিলিয়ে কোটবাড়ি যেন এক জীবন্ত পাঠশালা।
কোটবাড়ি মূলত কুমিল্লা শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’, যা মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রেখেছে। আরও রয়েছে বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (BARD), যা শিক্ষা ও উন্নয়ন চিন্তাধারার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু কোটবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ‘ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক জোন’। এটি প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন বহনকারী অঞ্চল, যেখানে শালবন বিহার, ইটাখোলা মুরা, রুপবান মুরা ইত্যাদি স্থাপনাগুলো রয়েছে। ৭ম-১২শ শতাব্দীর প্রাচীন সভ্যতার ছোঁয়া পাওয়া যায় এসব স্থানে। শালবন বিহারের খননকৃত এলাকায় পাওয়া গেছে বৌদ্ধ মঠ, প্রতিমা, ব্রোঞ্জের মূর্তি ও তাম্রলিপি, যা বর্তমানে কুমিল্লা প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে সংরক্ষিত।
কোটবাড়িতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। চারপাশে সবুজ গাছপালা, উঁচু-নিচু টিলা, পাখির কলকাকলি আর মিষ্টি বাতাসে যেন মনে হয় প্রকৃতি এখানে আপন ঘর বানিয়ে বসেছে। পর্যটকদের জন্য কটেজ, রেস্ট হাউজ, রেস্টুরেন্টসহ সব সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। পারিবারিক ভ্রমণ, পিকনিক কিংবা একদিনের ট্যুর—সবকিছুর জন্যই কোটবাড়ি একটি আদর্শ স্থান।
কোটবাড়ি কুমিল্লাঃ – ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মিলনস্থল।
এটি কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এবং একটি প্রাকৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে ভরপুর এলাকা হিসেবে পরিচিত। সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি, প্রাচীন ইতিহাস, মন্দির ও জাদুঘরের সমন্বয়ে কোটবাড়ি ।
কোটবাড়ির চারপাশ জুড়ে সবুজ টিলা, মেঠোপথ ও নানা জাতের গাছপালায় ঘেরা এক শান্তিপূর্ণ এলাকা। এখানে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়, বিশাল গাছের ছায়া আর পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ করে ভোরের কুয়াশা ঢাকা টিলা এবং সন্ধ্যার নরম আলোয় পুরো জায়গাটা যেন এক স্বপ্নপুরী হয়ে ওঠে।
কোটবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হল এর ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ। এখানেই অবস্থিত:
শালবন বিহার: একটি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, যা পাল আমলের স্মৃতি বহন করে।
ময়নামতি জাদুঘর: এখানে প্রত্নতত্ত্ব অনুসন্ধানে পাওয়া নানা বুদ্ধমূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, শিলালিপি, প্রাচীন অস্ত্র, মুদ্রা প্রভৃতি সংরক্ষিত আছে।
ইটাখোলা মুরা, কোটিলা মুরা – বৌদ্ধ স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যএখানে রয়েছে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন মন্দির ও বিহার। শালবন বিহারে বহু বিদেশি পর্যটক ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী আসেন। স্থানীয়দের জন্য এটি একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
কোটবাড়িতে রয়েছে:
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (BARD) – দেশের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান।
কোটবাড়ি পার্ক ও শিশু বিনোদন কেন্দ্র – পরিবারসহ বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ স্থান।
কোটবাড়ি চিড়িয়াখানা (কমিল্লা জু) – নানা জাতের পশুপাখির সমারোহে একটি ছোট চিড়িয়াখানা।
ক্যাম্পিং ও পিকনিক স্পট – শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের গ্রুপ ট্যুরের জন্য জনপ্রিয়।
ছবি তোলার মনোমুগ্ধকর লোকেশনপাহাড়ি টিলা, জাদুঘরের পুরনো নিদর্শন, সবুজে ঘেরা রাস্তা এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য – সব মিলিয়ে কোটবাড়ি ফটোগ্রাফার ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক আদর্শ স্থান।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে চাইলে আপনি বাস, ট্রেন বা প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। বাসে গেলে সায়েদাবাদ বা যাত্রাবাড়ী থেকে সরাসরি কুমিল্লা শহরে নামতে পারবেন। তারপর কুমিল্লা শহর থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিতে করে মাত্র ২০-৩০ মিনিটেই পৌঁছে যাবেন কোটবাড়ি। যারা ট্রেনে যেতে চান, তারা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কুমিল্লাগামী ট্রেনে উঠতে পারেন—সেখান থেকেও একইভাবে সহজে যাওয়া যায়।
ভ্রমণের সময় যা মনে রাখবেন:
- প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন
- প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে ভাঙচুর বা অবমাননাকর আচরণ করবেন না
- গাইড নিয়ে ঘুরলে ইতিহাস জানতে সুবিধা হবে
- নিজের পানীয় জল ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখতে পারেন
কোটবাড়িতে ঘোরার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হলো শীতকাল। এই সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে, প্রাকৃতিক দৃশ্যও থাকে পরিষ্কার ও সবুজ। ভোরের কুয়াশা আর সূর্যের কিরণ মিলে তৈরি করে এক স্বর্গীয় দৃশ্য, যা দেখলে মন ভরে যায়। বিশেষ করে ছুটির দিনে কোটবাড়িতে গেলে দেখা মিলবে শত শত পর্যটকের, যারা পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাতে এসেছেন।
থাকার ব্যবস্থা: কোটবাড়ির আশেপাশে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ রয়েছে। চাইলে আপনি কুমিল্লা শহরে থেকেও কোটবাড়ি ঘুরে আসতে পারেন। যারা পরিবারসহ যাচ্ছেন, তাদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশ রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, কোটবাড়ি কেবল একটি স্থান নয়, এটি ইতিহাস, শিক্ষা, প্রকৃতি ও অনুভবের এক মিলনমেলা। এটি এমন এক জায়গা যেখানে আপনি একদিনের মাঝেই ইতিহাসে হারিয়ে যেতে পারেন, প্রকৃতির সান্নিধ্যে মনকে হালকা করতে পারেন এবং সময় কাটাতে পারেন প্রিয়জনদের সঙ্গে। ব্যস্ত জীবনে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইলে কোটবাড়ি হতে পারে আপনার পরবর্তী স্বপ্নের গন্তব্য।
ঘুরে আসুন, কোটবাড়ি আপনার অপেক্ষায়... 






