বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্যের অন্যতম নাম দেবতাখুম। বান্দরবানের রুমা উপজেলার পানছড়ি এলাকায় অবস্থিত এই খুমটি এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। শান্ত নদী, সুউচ্চ পাথরের দেয়াল, সবুজের ছায়া আর রোমাঞ্চকর নৌকা ভ্রমণ—সব মিলিয়ে দেবতাখুম এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই আর্টিকেলে আমরা দেখব ঢাকা থেকে দেবতাখুম ভ্রমণের জন্য সম্পূর্ণ ট্যুর প্ল্যান, খরচ, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় টিপস। বান্দরবান শহর থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা সম্ভব এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করে।
বান্দরবান থেকে ১.৩০ ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় রোয়াংছড়ি, সেখান থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যেতে হয় কচ্ছপথলি বাজার। সেখান থেকে গাইড নিয়ে আর্মি ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করে দেবতাখুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে হয়।
আর্মি ক্যাম্পে ভোটার আইডি কিংবা অন্য যেকোন আইডির ফটোকপি জমা দিতে হয়।
কচ্ছপথলি থেকে দেবতাখুম যাওয়ার পুরো রাস্তাটি পায়ে হেঁটে যেতে হয়। রাস্তার দুরত্ব আনুমানিক ৮ কিলোমিটার। হেঁটে গেলে ১/১.৩০ ঘন্টার মত সময় লাগে।
যাওয়ার দুইটি রাস্তা আছে, একটি পাহাড়ি রাস্তা(একটু কষ্টকর) অন্যটি ঝিরি পথ। চাইলে কেউ এক রাস্তায় গিয়ে অন্য রাস্তায় ফেরত আসতে পারেন।
দেবতাখুম যাওয়ার আগে পরবে শীলবান্ধা পাড়া, সেখানে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করবেন দেবতাখুমের উদ্দেশ্যে। কিছুটা পথ নৌকায় যেয়ে বাকি পথ ভেলায় করে যেতে হয়। চাইলে পুরো পথ নৌকায়ও যাওয়া যায় কিন্তু আসল মজা ভেলায়।
সবকিছু দেখে, ছবি তুলে বিকেল ৫ টার মধ্যে আপনাকে আবার কচ্চপথলি আর্মি ক্যাম্পে এসে রিপোর্ট করতে হবে।
খাওয়া দাওয়া, গাড়ি ঠিক করা সব আগে থেকে ঠিক করে রাখলে চিন্তামুক্ত থাকা যায়। এই ব্যাপারে গাইড আপনাদের সাহায্য করবে।
ট্যুরপ্লানঃরাতের তুর্ণা নিশিতা ট্রেনে ঢাকা থেকে চিটাগং, সেখান থেকে বাসে বান্দরবান অথবা সরাসরি ঢাকা থেক রাতের বাসে বান্দরবান।
বান্দারবান থেকে অটো অথবা জীপে করে কচ্চপথলি।
কচ্চপথলি থেকে পায়ে হেটে শীলবান্ধা, দেবতাখুম।
একি পথে ফেরত এসে চাইলে কেউ কচ্চপথলি/বান্দারবান রাত্রিযাপন করতে পারেন অথবা রাতের বাসে চিটাগং কিংবা ঢাকা চলে আসতে পারেন।
খরচপত্রঃ- ঢাকা থেকে চিটাগং ট্রেনে আসা যাওয়া(৩৪৫*২) ৬৯০৳
- স্টেশন থেকে বহদ্দারহাট আসা যাওয়া(১৫*২) ৩০৳
- সকালের নাস্তা ৫০৳ (বাস টার্মিনালে)
- চিটাগং থেকে বান্দরবান আসা যাওয়া (১৩০*২) ২৬০৳
- দুপুরের খাবার ২০০৳ (বান্দরবান হিল ভিউ রেস্টুরেন্ট)
- বান্দরবান থেকে কচ্চপতলি আসা যাওয়া মাহিন্দ্রা আটো(৬জন) (১৮০০/৬) ৩০০৳
- গাইড (১০০০/৬) ১৬৬৳
- ভেলা+লাইফ জ্যাকেট ১৫০৳
- রাতের খাবার ১৫০৳ (হিল ভিউ রেস্টুরেন্ট)
- টোটালঃ ১৯৯৬ টাকা
- শুধু চিটাগং থেকে গেলে খরচ পরবে ১৫০০ টাকার মত।
ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে না ফেলে সেগুলো নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন। পরে নির্ধারিত যায়গায় সেগুলো ফেলে দিবেন। প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসুন।ঢাকা থেকে দেবতাখুম: যাত্রার প্রস্তুতি
ভ্রমণের প্রথম ধাপ হলো ঢাকা থেকে বান্দরবান পৌঁছানো। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। রাতের বাসে যাওয়া সবচেয়ে ভালো, এতে করে সময় সাশ্রয় হয়।
- বাস সার্ভিস (ঢাকা–বান্দরবান):
- এস আলম, হানিফ, শ্যামলী, ডলফিন
- ভাড়া: নন-এসি ৭০০–৮০০ টাকা, এসি ১২০০–১৫০০ টাকা
- যাত্রার সময়: ৮–১০ ঘণ্টা (রাত ১০টার বাসে উঠলে সকাল ৬–৭টার মধ্যে বান্দরবান পৌঁছাবেন)
বান্দরবান থেকে রুমা বাজার
বান্দরবান পৌঁছে আপনাকে রুমা বাজার যেতে হবে। সরাসরি রুমা বাজারে যাওয়ার জন্য চান্দের গাড়ি বা জিপ রিজার্ভ করতে হবে।
চান্দের গাড়ি (বান্দরবান–রুমা):
- সময়: ৩–৪ ঘণ্টা
- ভাড়া: প্রতি গাড়ি ৩৫০০–৪৫০০ টাকা (আংশিক ভাগেও পাওয়া যায়)
বিকল্প:
- গাইড ফি | ৩০০–৫০০ |
- রুমা বাজারে রাত থাকা | ৩০০–৫০০ |
- খাবার | ৫০০–৭০০ |
- অন্যান্য (টিপস/জ্যাকেট) | ২০০–৩০০ |
- মোট আনুমানিক খরচ* | *৩৮০০–৪৫০০ টাকা* |
ভ্রমণের সেরা সময়
- সেপ্টেম্বর–মার্চ মাস সবচেয়ে উপযুক্ত
- বর্ষায় পানি বেশি থাকলে খুম আরও সুন্দর দেখায়, তবে সতর্কতা জরুরি
- বৃষ্টির দিনে ট্র্যাকিং কষ্টকর হতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিতে হবে
যা সাথে রাখা উচিত
- পানি ও শুকনো খাবার
- স্যান্ডেল বা গ্রিপযুক্ত জুতা
- পাওয়ার ব্যাংক
- ওষুধ ও ব্যান্ডেজ
- আইডি কার্ড (সিকিউরিটি চেকপোস্টে প্রয়োজন হয়)
সিক্রেট টিপস ও গুরুত্বপূর্ণ দিক
1. টিম করে যান: ৫–৬ জনের টিম হলে খরচ অনেক কমে যায়
2. লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই নিন – আপনার নিরাপত্তার জন্য
3. স্থানীয় গাইড নিন – তারা রাস্তাও দেখাবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে
4. রুমা ও রেমাক্রীতে নেটওয়ার্ক দুর্বল – আগেই যোগাযোগ সেরে নিন
5. লোকাল খাবার ট্রাই করুন – যেমন বাঁশে রান্না করা চিকেন, পাহাড়ি সবজি
ফেরার পরিকল্পনা
দেবতাখুম ঘুরে এসে রেমাক্রী থেকে রুমা, তারপর বান্দরবান হয়ে ঢাকায় ফেরত আসার জন্য আবার একইভাবে চান্দের গাড়ি ও বাস ধরতে হবে। চাইলে বান্দরবানে একরাত কাটিয়ে মেঘলা, নীলাচল বা নাফাখুম ঘুরেও নিতে পারেন।
সাধারণত সকালে লোকাল চান্দের গাড়ি চলে। ১০–১২ জনের দল হলে গাড়ি রিজার্ভ করাই সুবিধাজনক।
রুমা বাজার থেকে দেবতাখুম যাত্রা
রুমা বাজার থেকে আবার যেতে হবে তিন্দু বা সাংসাং প্রপারের কাছে। চাইলে রুমায় রাত কাটিয়ে সকালে রওনা দিতে পারেন। রুমা থেকে দেবতাখুমে যেতে হলে প্রথমে নৌকা, তারপর হাঁটা ও আবার নৌকা লাগে।
ভ্রমণ ধাপ:
1. রুমা বাজার → রেমাক্রী (নৌকা):
- সময়: ১.৫ ঘণ্টা
- নৌকা ভাড়া: ২০০০–২৫০০ টাকা (আনুমানিক)
- ৫–৬ জন মিলে ভাগাভাগি করে নিতে পারেন
2. রেমাক্রী → সাথা পাথর → দেবতাখুম:*
- ৩০–৪০ মিনিট হাঁটা বা পাথরের ওপর ট্র্যাকিং
- পথে পড়বে “সাথা পাথর”—এটিও একটি সুন্দর পর্যটন পয়েন্ট
- এরপর ছোট নৌকায় খুমের ভিতর প্রবেশ
দেবতাখুম এক্সপ্লোরেশন দেবতাখুমে যা থাকছে:
- সরু পাথরের দুই পাশের দেয়াল, মাঝে পানির ধারা
- নৌকায় বসে প্রবেশ করতে হয় খুমের ভেতরে
- চারদিকে পাথর ও সবুজ বন
- ঠাণ্ডা পানি ও ছায়াময় পরিবেশ
নৌকা ভাড়া (খুমের ভিতর):
- ২০০–৩০০ টাকা
- সময়: প্রায় ২০–৩০ মিনিট খুমের ভিতর ঘুরতে পারবেন
এই সময় লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক। ট্র্যাকার বা গাইড থাকলে ভালো, কারণ পথ ঘুরিয়ে নিতে হতে পারে এবং অনেক জায়গা পিচ্ছিল।
খরচের বিবরণ (প্রতি মাথা)
খাত আনুমানিক খরচ
- ঢাকা–বান্দরবান বাস | ১৪০০ (দুইপথে) |
- বান্দরবান–রুমা (জিপ) | ৫০০ (শেয়ার করে) |
- নৌকা (রুমা–রেমাক্রী) | ৪০০ (শেয়ার) |
দেবতাখুম একটি রোমাঞ্চকর ও মনোমুগ্ধকর জায়গা। যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন, ট্র্যাকিং ও পানির ধারে সময় কাটাতে চান—তাদের জন্য এটি আদর্শ। ঢাকা থেকে একটু প্ল্যান করে গেলে একদিনে বা একরাতে এই ট্রিপ করা সম্ভব। নিরাপদ, প্রাকৃতিক ও তুলনামূলক কম খরচে এমন অভিজ্ঞতা বারবার পাওয়া যায় না। চলুন, ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে হারিয়ে যাই দেবতাখুমের স্বর্গীয় প্রকৃতিতে।

