ঢাকার ব্যস্ততা, ধুলো‑রোদ, গাড়ির হর্ন—এই সবকে কয়েকঘণ্টা ছেড়ে কোন‑একটু নির্মল ঠাঁই খুঁজছেন? তাহলে সীতাকুণ্ড আপনার জন্য হতে পারে আদর্শ বিকল্প। পাহাড় ও মেঘে ঘেরা হ্রদ, সমুদ্রের শুকনো হাওয়া, বোধ্য এবং adventure ট্রেইল—সব মিলিয়ে সীতাকুণ্ড ভ্রমণ হয়ে ওঠে একদিনের জন্য চিন্তামুক্ত অন্যরকম সময়।
সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজিলা। কেবল ব্যস্ত শহরের কাছেই নয়, বরং প্রকৃতির কোলে। এখানে রয়েছে চন্দ্রনাথ পাহাড় (Chandranath Hill), সুপ্তধারা ঝর্ণা, জহরঝরী ঝর্ণা, সমুদ্র সৈকত সহ অনেকে‑অনেকে জায়গা যা এক দিনের ভ্রমণটিকে স্মরণীয় করে তোলে।
এই আর্টিকেলে আমরা দেখব—ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ডে কীভাবে যাওয়া যায়, একদিনের ট্যুর প্ল্যান কেমন হবে, এবং সীতাকুণ্ড ও তার আশেপাশের দর্শনীয় স্ফটকগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য। প্রস্তুত হোন নতুন অভিজ্ঞতার জন্য।
যাওয়া‑আসার উপায়
ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড যেতে হলে প্রথম ধাপ হলো চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছানো। আপনাদের কাছে কয়েকটি বিকল্প রয়েছে:
বাস বা মাইক্রো: ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ঘাটাইল অথবা সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে বের হয়। সময় লাগে প্রায় ৬–৮ ঘণ্টা।
ট্রেন: ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এক্সপ্রেস ট্রেনের সুবিধা রয়েছে, এরপর সীতাকুণ্ডের দিকে রওনা।
চট্টগ্রামে এসে সীতাকুণ্ডের জন্য সিএনজি, শেয়ার ভ্যান বা অটো‑রিকশা পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড় বা ইকো পার্ক যাওয়ার জন্য সিএনজি বা হোয়েল ভাড়া করার সুবিধা রয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড বাজার সাধারণত ১‑২ ঘণ্টা সময় নেয়। এরপর হিল ট্রেইল বা পাহাড়ি রাস্তায় আরও কিছু সময় লাগতে পারে।
নিশ্চিত করুন যে যাত্রার সময়সূচি এমন ভাবে নির্বাচন করেছেন যাতে আপনি দিনের আলোতে পৌঁছাতে পারেন—সন্ধ্যার আগে হিল ট্রেইল শেষ করা নিরাপদ।
এক‑দিনের দর্শনীয় স্থান ও ট্রেইল
সীতাকুণ্ডে একদিনে ঘুরে দেখা সম্ভব এমন কিছু বড় আকর্ষণীয় স্থান নিচে দেওয়া হলো:
১. চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির
এই পাহাড়টির উপর চন্দ্রনাথ মন্দির—বাংলাদেশের পুরনো শাক্তিপীঠগুলোর একটি। শীর্ষভাগ থেকে সমুদ্র‑সাগর দেখা যায়। ট্রেইল বা সি.এন.জি রাইডের মাধ্যমে উপরে ওঠা যায়। [2]
২. সুপ্তধারা ও জহরঝরী ঝর্ণা
একদিনের ট্রেইলে এক ঝরনায় সময় কাটানো যায়। ফরেস্ট ট্রেইল, সাঁতার বা প্রাকৃতিক বালি‑চর এমন অভিজ্ঞতা দেবে।
৩. গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত
হাওরের মাঝখানে সাদা বালি ও সৈকতের সঙ্গে ঘন গাছপালা—কিছুটা আলাদা সৈকতের পরিবেশ। শান্ত পরিবেশে ছবি তোলা, হাঁটা স্পট হিসেবে জনপ্রিয়।
৪. বনভিত্তিক ট্রেইল ও ইকো পার্ক
সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন—সবুজের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর জন্য উত্তম।
ব্যয় ও সময়সূচি
এক দিনের ট্যুরের জন্য আনুমানিক খরচ নিচে দেওয়া হলো (ঢাকা থেকে ইসলামিক পরিবহনায় হঠাৎ কিছু ভ্যারিয়েশন থাকতে পারে):
- ঢাকা → চট্টগ্রাম বাস/ট্রেন: ≈ ৳৮০০–১৫০০
- চট্টগ্রাম → সীতাকুণ্ড রাউন্ড ট্রিপ সিএনজি/অটো: ≈ ৳৫০০–১০০০ (শেয়ারভ্যানে কম হবে)
- হিল ট্রেইল বা সি.এন.জি ভাড়া: ≈ ৳৩০০–৬০০
- খাবার/পানি/বাগান প্রবেশ: ≈ ৳২০০–৫০০
- মোট আনুমানিক খরচ হতে পারে ৳১৮০০–৩০০০ এর মধ্যে।
ট্যুর পরিকল্পনা নমুনা
- সকাল ৬টায় ঢাকা ত্যাগ
- সকাল ১০‑১১ টার দিকে চট্টগ্রাম পৌঁছানো
- দুপুর ১২ টায় সীতাকুণ্ড পৌঁছানো এবং হালকা খাবার
- বিকেল ১‑২ টায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠা
- বিকেল ৪ টায় গুলিয়াখালি সৈকতে সময় কাটানো
- সন্ধ্যা ৫‐৬ টায় ফিরে চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা
- রাত ৯‐১০ টায় ঢাকা ফেরার পথে
আপনি কি কখনো এতটা পরিষ্কার‑আকাশে, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখেছেন? সীটাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে এমন দৃশ্য পাওয়া সম্ভব, আর সেটাই হয় এক নতুন অনুভূতি। পাহাড়ি রাস্তা ধরেই হাওয়ার খোঁচা, গাছপালার গা ঘেঁষে চলা, আর হঠাৎ বেসুরে খোঁজামেলা খালসুবিধা—এই মিলনটাই ভ্রমণপিপাসুদের মন ছিনিয়ে নেয়।
রিসোর্ট বা হোটেলে রাত কাটানোর সুযোগ না পেলেও একদিনেই এই গন্তব্য ঠিকই আপনাকে ‘অন্যান্য ব্যাপার ভুলিয়ে’ দেবে। ঝর্ণার শব্দ, বনের পথ, সমুদ্র‑হাওয়ার রেশ—এই সব মনে হয় এক‑একটা গল্প বলছে।
ট্রেইল সময় ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ থাকলেও সেই চ্যালেঞ্জই হয় ট্রিপের সেরা অংশ। পাহাড়ি পা হাঁটা, সি এন জি ভাড়া, হঠাৎ দেখা মেঘের সারি—সিতো সুখকর।
নিম্নলিখিত কিছু বিষয় আপনাকে আরও ভালো অভিজ্ঞতা দেবে:
- পূর্বে রুট ও সময়সূচি পর্যালোচনা করুন
- হালকা ব্যাগ ও আরামদায়ী জুতা নিন
- যদি যান ১১ মাসে বা বর্ষার মধ্যে, তাহলে ঝড় বা বৃষ্টির কারণে পথ সঙ্কুচিত হতে পারে
- গুলিয়াখালি বা সমুদ্র সৈকতে সন্ধ্যার আলো দেখতে একান্ত সময় মাত্র
এই মিলিয়ে সীতাকুণ্ড হয়ে ওঠে এক দিনের জন্যও যথেষ্ট পরিপূর্ণ.
স্মরণীয় ভ্রমণ মানে শুধু বেশি ছবি তোলা নয়—বরঞ্চ সেটি হয় এমন একটি মুহূর্ত, যেখানে আপনি নিজেকে থামিয়ে দেন, মনের কোণে শান্তি খুঁজেন, এবং ফেরার পথে বলবেন—“ঠিকই বেছে নিয়েছিলাম”।
সীতাকুণ্ড আপনার পরবর্তী গন্তব্য হলে সেটি হোক আনন্দময়, নিরাপদ এবং স্মৃতিময়।
ভ্রমণ হোক সাবধান ও উপভোগ্য!

