বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বরিশাল শুধুমাত্র নদী-নালায় ঘেরা একটি শহর নয়, এটি প্রকৃতির হৃদয়ে গাঁথা এক টুকরো শান্তির নাম। “ভেনিস অব দ্য ইস্ট” নামে পরিচিত এই অঞ্চল তার জলপথ, ভাসমান বাজার, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। যাদের ভ্রমণে প্রাকৃতিক শোভা, ঐতিহ্যের ছোঁয়া ও গ্রামীণ বাংলাদেশের স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে—তাদের জন্য বরিশাল হতে পারে নিখুঁত একটি গন্তব্য।
বরিশালে ভ্রমণ শুধু চোখের জন্য নয়, এটি আত্মার জন্যও এক বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা। সকালে নৌকায় চড়ে পেয়ারার ভাসমান বাজার দেখা, দুপুরে গুথিয়া মসজিদের স্থাপত্যে হারিয়ে যাওয়া, আর সন্ধ্যায় কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা—এখানে প্রতিটি মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের কবিতা। ঢাকার তুলনায় পরিবহনমাত্রায় ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এক‑দিন বা সাপ্তাহিক ট্রিপ হিসেবে বরিশালের ঘুরে আসা বেশ সহজ। নিচে এমন ১০টি দর্শনীয় স্থান দেওয়া হলো, যেগুলি ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী—সঙ্গেই রয়েছে যাতায়াতের উপায় ও কার্যকর টিপস।
১. দুর্গাসাগর (Durga Sagar, Babuganj)
দক্ষিণবাংলার বৃহত্তম পুকুর – Babuganj উপজেলায় অবস্থিত দুর্গাসাগর এক মনোরম স্থান। ঘন সবুজ গাছপালা ঘেরা পায়রে পাড়, দিঘির মাঝখানে সরু পথ দৃষ্টিনন্দন। শহর থেকে প্রায় ২৫–৩০ মিনিটের পথ। বাস বা অটো নিয়ে ‘Babuganj বাসস্ট্যান্ড’ নামক স্থানে নেমে স্থানীয় পরিবহন নিতে হয়।
২. বিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার (Floating Guava Market – Bhimruli)
বাংলাদেশের অনন্য ভাসমান বাজার – খাল পথে ছোট নৌকায় পেয়ারা বিক্রি হয় ভোরবেলায়। পর্যটক আর স্থানীয় চাষিদের মেলবন্ধন এখানে অন্যরকম। শহর থেকে বাস বা নৌকা যোগে যেতে হয়। ভোর ৬টা‑৯টার মধ্যে যাওয়া উত্তম।
৩. গুথিয়া মসজিদ (Guthia Mosque, Wazirpur)
ওজিরপুর উপজেলায় অবস্থিত এই মসজিদটি তার বিশাল গম্বুজ ও সুসজ্জিত ছাঁদ‑ছায়ার জন্য জাগ্রত। শহর থেকে বাস বা মাইক্রোবাসে যেতে হয়।
৪. (Lakhutia Zamindar Bari, Kashipur)
কাশিপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি পুরনো জমিদার বাড়ি, যেখানে পুরনো বাংলার স্থাপত্য ও ঐতিহ্য দেখা যায়। শহর থেকে নতুন বাজার বাসস্ট্যান্ড হয়ে অটো রিকশা করে পৌঁছানো যায়। [2]
৫. অক্সফোর্ড মিশন চার্চ (Oxford Mission Church)
বরিশাল শহরের সূত্রাপাড়ায় অবস্থিত এই গীর্জাটি কালো‑লাল ইটের নির্মিতি ও টুথচূঁড়া নকশার জন্য খ্যাত। রিকশা বা অটো চলাচল সহজ।
৬. কীর্তনখোলা নদীর তীর (Kirtankhola Riverbank)
বরিশাল শহরের প্রাণনদী কীর্তনখোলা – সন্ধ্যার সময় নদীর পাড়ে হাঁটা, নৌকা ভ্রমণ, সানসেট সবই মিলিয়ে এক আদর্শ পরিবেশ দেয়। বাস বা লঞ্চ অনুসারে নদীতীর পৌঁছানো যায়। [3]
৭. কালেক্টরেট ভবন (Collectorate Bhaban, Barishal)
১৮২১ সালে নির্মিত এই ব্রিটিশ উপনিবেশকালের ভবন এখন জাদুঘর হিসেবে খোলা। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য উপযোগী। শহরের কেন্দ্রস্থলে—রিকশা বা হাঁটেই যাওয়া যায়। [4]
৮. শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু (Serniabat Bridge, Dapdapiya)
কীর্তনখোলা নদীর ওপর সৃষ্টি এই সেতু থেকে নদীর দৃশ্য ও সেতুর নিচ দিয়ে চলা লঞ্চ‑নৌকার রমণীয় উপভোগ করা যায়। সন্ধ্যার হালকা আলোতে সময় কাটাতে ভালো। [5]
৯. মহনিয়ার দীঘি (গজনীর দীঘি) (Ghazni Dighi, Chandpur U.)
চাঁদপুর ইউনিয়নের এই প্রাচীন দীঘিটি ইতিহাস ও নীরবতায় ভরপুর। শহর থেকে অটো বা লঞ্চ‑মিশ্র পথ ধরে পৌঁছানো সহজ। [2]
১০. ৩০ গোডাউন (River View Park) (30 Godown/30 Warehouse Riverside Park)
কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত এই পার্ক‑স্পট পরিবারসহ ঘুরতে ভালো জায়গা। শহর থেকে অটো রিকশায় সহজে যাওয়া যায়।
যাতায়াত ও পরিকল্পনার জন্য টিপস
ঢাকা বা অন্যান্য শহর থেকে বরিশালে যাতায়াতের জন্য বাস, ট্রেন ও লঞ্চ রয়েছে। বরিশাল শহরে পৌঁছে স্থানীয় বাস, অটো‑রিকশা বা লঞ্চ ব্যবহার করে উপরের স্পটগুলোতে যাওয়া যায়।
ভ্রমণশুরুর আগে ওয়েদার চেক করুন—বরিশাল এলাকায় রাতভর যানবাহন‑সুবিধা কম হতে পারে। টাকা ও মোবাইল চার্জে রাখুন। প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি আগে থেকে খবর নিয়ে নেওয়া ভালো।
বরিশাল শুধু নদী‑চর ও পেয়েরা‑বাজারের জন্য নয়—এটি ইতিহাস, প্রকৃতি ও প্রতিদিনের জীবনের মিলনক্ষেত্র। আপনার যদি ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা থাকে, তাহলে উপরের ১০টি স্থান এক এক্সপ্লোর করুন। ভালো পরিকল্পনায় বরিশাল ভ্রমণ হবে স্মরণীয় ও ফলপ্রসূ!
এই ভ্রমণ কেবল ছবি তোলার জন্য নয়, এটি অন্তরের প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার একটি যাত্রা। আপনি যদি প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চান, প্রযুক্তি থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে নিতে চান—তাহলে বরিশালই হতে পারে আপনার পরবর্তী ঠিকানা।
ভবিষ্যতের ভ্রমণের তালিকায় বরিশালকে স্থান দিন। ভালোভাবে পরিকল্পনা করে, সময় নিয়ে ঘুরে দেখুন এই সৌন্দর্যে ভরা অঞ্চলটি। বিশ্বাস করুন, একবার বরিশাল গেলে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে।

